ধাঁধা কি ?

ধাঁধা লোকসাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য শাখা। একে হেঁয়ালিও বলা হয়। ধাঁধায় পল্লীর জনগণের অর্জিত অভিজ্ঞতাকে প্রশ্নের আকারে লিপিবদ্ধ করা হয়। প্রতিটি ধাঁধার মাধ্যমে একটি করে প্রশ্ন করা হয় এবং সেই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তার উত্তরটি। এমনিভাবে যে বাক্য দ্বারা একটিমাত্র ভাব রূপকের সাহায্যে জিজ্ঞাসার আকারে প্রকাশ করা হয় তাকেই বলা হয় ধাঁধা।

 

ধাঁধার আবেদন মূলত বুদ্ধিগ্রাহ্য। ধাঁধা জ্ঞানেরও বিষয়, আবার রসেরও সামগ্রী। এর মধ্য দিয়ে উত্তরদাতার উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায়। ধাঁধা জনসাধারণের মনে জীবন ও জগৎ সম্বন্ধে জানার কৌতূহল সৃষ্টি করে। ধাঁধার মধ্যে প্রখর বুদ্ধিবৃত্তি, সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণশক্তি, মননশীলতা, কৌতুক, স্মৃতিচর্চা, রূপক-প্রতীক ব্যবহারের প্রবণতা, নির্মল আনন্দদান, সৌন্দর্যবোধ ও রসবোধের পরিচয় পাওয়া যায়।

ধাঁধা - ১

আমার মা যখন যায় তোমার মার পাশে,
দুই মা হারিয়ে যায় নানার পুত্র হয় শেষে।

উত্তরঃ মামা

ধাঁধা - ২

দুধ দিয়া ফুল সাজে ,
খাইতে অনেক মিঠা লাগে।

উত্তরঃ সন্দেশ

ধাঁধা - ৩

কম দিলে যায় না খাওয়া, বেশি দিলে বিষ ,
মা বলেছে, বুঝে শুনে তার পরেতে দিস।

উত্তরঃ লবণ

ধাঁধা - ৪

চার পায়ে বসে,
আট পায়ে চলে রাক্ষস নয়,
খোক্ষস নয় আস্ত মানুষ গিলে।

উত্তরঃ পালকি

ধাঁধা - ৫

যে মুখে খায়,
সেই মুখে হাগে,
এই প্রাণি নিত্য রাত জাগে।

উত্তরঃ বাদুর

ধাঁধা - ৬

হাত দিলে বন্ধ করে,
সূর্যদোয়ে খোলে ঘোমটা দেওয়া স্বভাব,
তার মুখ নাহি তোলে।

উত্তরঃ লজ্জাবতী লতা

ধাঁধা - ৭

সাগর থেকে জন্ম নিয়ে আকাশে করে বাস,
মায়ের কোলে ফিরে যেতে জীবন হয় লাশ।

উত্তরঃ মেঘ

ধাঁধা - ৮

চক থেকে এলো সাহেব কোট-প্যান্ট পরে,
কোট-প্যান্ট খোলার পরে চোখ জ্বালা করে।

উত্তরঃ পেঁয়াজ

ধাঁধা - ৯

তিন অক্ষরে নাম তার অনেক লোকে খায়,
মধ্যের অক্ষর বাদ দিলে জিনিস রাখা যায়।

উত্তরঃ তামাক

ধাঁধার প্রকারভেদঃ

ধাঁধাকে দুভাগে ভাগ করা যায়:

১) লৌকিক ধাঁধাঃ লৌকিক ধাঁধার মধ্যে বিষয়টি সহজ কথায় সংক্ষিপ্তভাবে প্রকাশ করা হয়।

২) সাহিত্যাশ্রয়ী ধাঁধাঃ সাহিত্যিক ধাঁধায় বিচিত্র রূপ ও অলঙ্কারের সাহায্যে ব্যক্ত করা হয়। সাহিত্যিক ধাঁধার ব্যবহার বৈদিক যুগ থেকে চলে আসছে। বাংলা সাহিত্যে চর্যাপদ, চন্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল ও শিবমঙ্গল কাব্যে এবং নাথসাহিত্যে গোপীচন্দ্রের গান, গোরক্ষবিজয়, বাউল গান ও কবিগানে বহু সাহিত্যিক ধাঁধার সন্ধান পাওয়া যায়।

ধাঁধা - ১০

তেল চুকচুক পাতা,
ফলের ওপর কাঁটা,
পাকলে হয় মধুর মতো,
বিচি গোটা গোটা।

উত্তরঃ কাঁঠাল

ধাঁধা - ১১

তিনটি র্বণে নামটি তার,
রসাল এক ফল,
ছাড়িয়ে মধ্যবর্ণ হয় যে আরেক ফল।

উত্তরঃ কমলা

ধাঁধা - ১২

জলে জন্ম,
ঘরে বাস,
জলেতে পড়লে সর্বনাশ।

উত্তরঃ লবণ

ধাঁধা - ১৩

ঘরের মইধ্যে ঘর,
নাচে কনে-বর।

উত্তরঃ মশারি

ধাঁধা - ১৪

আল বেয়ে যায় সাপ,
ফিরে ফিরে চায় বাপ।

উত্তরঃ সুঁই-সুতো

ধাঁধা - ১৫

রাজা-মন্ত্র্রি-সৈন্য মিলে নৌকা চড়ে যুদ্ধে যায় জীবন তো দূরের কথা,
ঢাল-তলোয়ার ছাড়াই কুপকাত।

উত্তরঃ দাবা খেলা

ধাঁধা - ১৬

হাতি নয় ঘোড়া নয়,
মোটা মোটা পা তরু নয়,
লতা নয়, ফুলে ভরা গা।

উত্তরঃ পালঙ্ক

ধাঁধা - ১৭

মানুষ নয় প্রাণীও নয়,
পিছে পিছে ঘোরে,
লাথি দিলে সেও যে লাথি দেয় জোড়ে।

উত্তরঃ ছায়া

ধাঁধা - ১৮

তিন অক্ষরের নাম তার,
বাংলাদেশে নাই,
প্রথম অক্ষর বাদ দিলে,
অনেক লোকে খায়।

উত্তরঃ জাপান

ধাঁধা আরও প্রকারভেদঃ

লৌকিক ধাঁধাকে বিষয় অনুসারে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:

  ১) নরনারী ও দেবদেবী-বিষয়কঃ

         ক. মানুষ ও তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংক্রান্ত,

         খ. ইতিহাস প্রসিদ্ধ নারী-পুরুষ সংক্রান্ত,

         গ. পৌরাণিক চরিত্র সংক্রান্ত,

         ঘ. দেবদেবী সংক্রান্ত।

 

 

  ২) প্রকৃতি-বিষয়কঃ

         ক. উদ্ভিদ ও লতাপাতা সংক্রান্ত,

         খ. আকাশ-গ্রহ-নক্ষত্র ও প্রকৃতি সংক্রান্ত।

 

 

  ৩) গার্হস্থ্য জীবনবিষয়কঃ

        ক. আত্মীয় ও অনাত্মীয় সম্পর্কীয় সংক্রান্ত,

         খ. খাদ্যবস্ত্ত সংক্রান্ত,

         গ. দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহূত জিনিসপত্র সংক্রান্ত,

         ঘ. আচার-আচরণ-অভ্যাস সংক্রান্ত,

        ঙ. আচার-অনুষ্ঠান-ক্রিয়াকর্ম সংক্রান্ত।

 

 

  ৪) পশুপাখি ও কীটপতঙ্গ-বিষয়ক,

  ৫) বাদ্যযন্ত্র সংক্রান্ত,

  ৬) আখ্যান বা কাহিনীমূলক,

  ৭) গাণিতিক বা সংখ্যামূলক,

  ৮) বিবিধ-বিষয়ক।

ধাঁধা - ১৯

অলি অলি পাখিগুলি গলি গলি যায়,
সর্ব অঙ্গ ছেড়ে দিয়ে চোখ খুবলে খায়।

উত্তরঃ ধোঁয়া

ধাঁধা - ২০

হাতে আছে,
হাতে নাই হাত বাড়ালে পাবি কই।

উত্তরঃ কনুই

ধাঁধা - ২১

দুই অক্ষরের নাম যার,
প্রসিদ্ধ একটি গাছ,
নামটি উল্টে দিলে পুঁতি চারাগাছ।

উত্তরঃ বটগাছ

ধাঁধা - ২২

সবকিছুই সে পাড়ি দিয়ে যায়,
নদীর পাড়ে গেলে অমনি থেমে যায়।

উত্তরঃ রাস্তা

ধাঁধা - ২৩

সকলের শিরে ধরে,
নাহি ধরে কেশে,
হাত নাই পা নাই,
বলো ধরে কে সে?

উত্তরঃ মাথাধরা

ধাঁধা - ২৪

আহার্য নয় তবু খায় সর্বজন,
অনিচ্ছাতে বাধ্য হয়,
করিতে ভক্ষণ।

উত্তরঃ আছাড়

ধাঁধা - ২৫

জলে রই,
স্থলে রই,
জল বিনা কিছু নয়।

উত্তরঃ বরফ

ধাঁধা - ২৬

লাল বরণ, ছয় চরণ,
পেট কাটলে হাঁটে,
মূর্খ লোকে বলবে,
কিসে পন্ডিতের শির ফাটে।

উত্তরঃ ডাস পিঁপড়া

ধাঁধা - ২৭

কাঁটা ভরা অঙ্গ তার,
সুদীর্ঘ আকার প্রাণ আছে,
শিরে কেশের সম্ভার জিহবার আগে মধু,
বিন্দু বিন্দু ঝরে জুড়ায় রসনাখানি, পান করে তারে।

উত্তরঃ খেঁজুর গাছ

ধাঁধা - ২৮

একটুখানি পুষ্পরিনী টলমল করে,
একটুখানি কুটা পাড়লে সর্বনাশ করে।

উত্তরঃ চোখ

ধাঁধা - ২৯

আাঁধার পুকুর,
গড়ান মাঠ,
বত্রিশ কলাগাছ,
একখানি পাট।

উত্তরঃ দাঁত ও জিহবা

ধাঁধা - ৩০

ছোট ছোট গাছখানি,
তার কত ফল ধরে,
একটা যদি খায় তবে আহা-উহু করে।

উত্তরঃ মরিচ

ধাঁধা - ৩১

আট পা আঠারো হাঁটু,
জাল ফেলিয়া মরা ঠেঁটু,
শুকনায় ফেলিয়া জাল,
গাছে উঠিয়া নিল ফাল।

উত্তরঃ মাকড়শা

ধাঁধা - ৩২

লাঠির মত গাছে,
সোনার ফল নাচে।

উত্তরঃ ভুট্টা গাছ

ধাঁধা - ৩৩

বিনা দুধে হইছে দই,
এমন কুমার পাব কই।

উত্তরঃ চুন

ধাঁধা - ৩৪

থাল ঝনঝন, থাল ঝনঝন থাল নিল চোরে,
বৃন্দাবনে লাগলো আগুন কে নিভাইতে পারে।

উত্তরঃ রোদ

ধাঁধা - ৩৫

একই মায়ের সন্তান মোরা,
আমি তাকে ভাই বলি,
সে আমায় বলে না ভাই,
বলুনতো কি সম্পর্ক তাই।

উত্তরঃ ভাইবোন

ধাঁধা - ৩৬

এই দেখলাম এই নাই,
কী বলব,
সবই রাজার ঠাঁয়।

উত্তরঃ বিদ্যুৎ

ধাঁধা - ৩৭

উপর থেকে পরলো বুড়ি,
হাত-পা তার আঠার কুঁড়ি।

উত্তরঃ কেল্লা

ধাঁধা - ৩৮

এমন একটি ফুল যে হয় উল্টা-পাল্টা,
যা-ই করি একই নাম হয়।

উত্তরঃ লিলি ফুল

ধাঁধা - ৩৯

দুই অক্ষরে নাম যার,
সবদেশেতে রয়,
সর্বদেশেই তার সুনাম,
দুর্নাম স্বাক্ষ্য হয়ে রয়।

উত্তরঃ নদী

ধাঁধা - ৪০

জমিন থেকে বেরুল টিয়ে,
লাল টুপি মাথায় দিয়ে।

উত্তরঃ পেঁয়াজ

ধাঁধা - ৪১

একটু খানি গাছে,
রাঙ্গা বউটি নাচে।

উত্তরঃ পাকা মরিচ

ধাঁধা - ৪২

আল্লাহর কি কুদরত,
লাঠির মাঝে শরবত।

উত্তরঃ আখ

ধাঁধা - ৪৩

রাজার বাড়ির ছুড়ি,
এক বিয়ানেই বুড়ি।

উত্তরঃ কলাগাছ

ধাঁধা - ৪৪

আকাশে টিরিবিরি,
চৌড়ালে বাসা,
আহারে খাইলো ছা,
এ কেমন তামাশা।

উত্তরঃ বাজপাখি

ধাঁধা - ৪৫

খড়িতে জড়াজড়ি,
ফলে অধিবাস,
ফুল নাই ফল নাই,
ধরে বারো মাস।

উত্তরঃ পান

ধাঁধা - ৪৬

হরি হরি দন্ড,
ছিরি ছিরি পাত,
মাণিক দন্ড,
য়োলখানি হাত।

উত্তরঃ সুপারী গাছ

ধাঁধা - ৪৭

এ পাড় মালসা,
ও পাড় মালসা,
মধ্যখানে লাল তামসা।

উত্তরঃ মসুরডাল

ধাঁধা - ৪৮

এক গাছে তিন তরকারী,
দাঁড়িয়ে আছে লালরিহারী।

উত্তরঃ সজনে

ধাঁধা - ৪৯

গা করে তার খসর মসর,
পাত করে তার ফেনী ফুল করে তার লাল তামাসা,
ফল করে কুস্তনি।

উত্তরঃ শিমূল

ধাঁধা - ৫০

কাঁচাতে যেই ফল সর্বজনে খায়,
পাঁকলে সেই ফল গড়াগড়ি যায়।

উত্তরঃ ডুমুর

ধাঁধা - ৫১

তলে মাটি উপরে মাটি,
তার মধ্যে সুন্দর বেটি।

উত্তরঃ হলুদ

ধাঁধা - ৫২

রাজার বেটা রাম দাস,
খায় খোলা তার ফেলায় শাঁস।

উত্তরঃ চালতা

ধাঁধা - ৫৩

ইকরের তলে তলে ভিকমতির ছানি, কোন দেশে দেখিয়াছ গাছের আগায় পানি।

উত্তরঃ নারিকেল

ধাঁধা - ৫৪

এক থালা সুপারী,
গণিতে পারে কোন ব্যাপারী।

উত্তরঃ আকাশের তারা

ধাঁধা - ৫৫

সকালে চার পায়ে হাঁটে,
দুপুরে দুই পায়ে,
সন্ধায় তিন পায়ে হাঁটে,
বলো তো কে যায়?

উত্তরঃ মানুষ

ধাঁধা - ৫৬

জ্বলছে তবু পুড়ছে না,
কোন সে প্রানী বলো তা।

উত্তরঃ জোনাকী

ধাঁধা - ৫৭

ইকরের তলে তলে ভিকমতির ছানি, কোন দেশে দেখিয়াছ গাছের আগায় পানি।

উত্তরঃ নারিকেল

ধাঁধা - ৫৮

দেয়াল আছে, ছাদও আছে,
এমন এক ঘর ভিতর তার প্রবেশ করার একটাও নেই দ্বার।

উত্তরঃ মশারি

ধাঁধা - ৫৯

একটুখানি জলে মাছ কিলবিল করে,
কারো বাবার সাধ্য নাই হাত দিয়ে তায় ধরে।

উত্তরঃ ফুটন্ত ভাত

ধাঁধা - ৬০

ছোট কালে লেজ হয়,
বড় কালে খসে বাঘের মত লাফ দেয়,
কুকেুরের মত বসে।

উত্তরঃ ব্যাঙ্গ

ধাঁধা - ৬১

লেজ, মাথা, পাখা আছে পাখি তবুও নয়, ডানা তার মেলে দিয়ে উড়ে চলে যায়।

উত্তরঃ উড়োজাহাজ

ধাঁধা - ৬২

লাল টুকটুক ছোটমামা,
গায়ে পরে অনেক জামা।

উত্তরঃ পেঁয়াজ

ধাঁধা - ৬৩

সারা মাথায় পক্ক কেশ,
মাথার ঘিলু খেতে বেশ।

উত্তরঃ তালের আঁটি

ধাঁধা - ৬৪

যমজ ভাই যায় আসে,
একবার গিয়ে না ফিরলে,
ধরেতে না প্রাণ থাকে।

উত্তরঃ শ্বাস-প্রশ্বাস

ধাঁধা - ৬৫

ছোট্ট একটা ঘরে,
পঞ্চাশ টুপি পরা সৈনিক বাস করে।

উত্তরঃ দেশলাই

ধাঁধা - ৬৬

চার রূপসী চার রং,
মিলন হলে এক রং।

উত্তরঃ পান-চুন-খয়ের-সুপারী

ধাঁধা - ৬৭

চার রূপসী চার রং,
মিলন হলে এক রং।

উত্তরঃ পান-চুন-খয়ের-সুপারী

ধাঁধা - ৬৮

যমজ ভাই যায় আসে,
একবার গিয়ে না ফিরলে,
ধরেতে না প্রাণ থাকে।

উত্তরঃ শ্বাস-প্রশ্বাস

ধাঁধা - ৬৯

ছোট্ট একটা ঘরে,
পঞ্চাশ টুপি পরা সৈনিক বাস করে।

উত্তরঃ দেশলাই